সরিষার রোগ ব্যবস্থাপনা

১. পাতা ঝলসানো রোগ (Alternaria blight)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Alternaria brassicae এবং Alternaria brassiaicola নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয় এবং বীজ বিকল্প পোষক ও বায়ুর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৭% এর অধিক এবং তাপমাত্রা ১২-২৫ ডিগ্রি সে. ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়।

রোগের লক্ষণ
১. এ রোগ প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নিচের বয়স্ক পাতায় ছোট, বাদামি গোলাকার দাগ আকারে আক্রমণ করে। পরবর্তীতে এ দাগ আকারে বড় হতে থাকে।
২. পরবর্তীতে গাছের পাতা, শুটি, কাণ্ড ও ফলে গোলাকার গাঢ় বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগগুলো ধূসর, গোলাকার সীমা রেখা দ্বারা আবদ্ধ থাকে। অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয় বড় দাগের সৃষ্টি করে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়।
৩. আক্রান্ত শুঁটি থেকে পাওয়া বীজ ছোট, বিবর্ণ এবং কুঁচকে যায় এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

রোগের প্রতিকার
১. রোগ সহনশীল জাত ব্যবহার করতে হবে। তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত দৌলত, বারি সরিষা ১০, বারি সরিষা ১১ ইত্যাদি জাতগুলো এ রোগ সহনশীল।
২. সঠিক সময়ে বীজ বপন করতে হবে অর্থাৎ অক্টোবরে  শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে।
৩. সুস্থ সবল  জীবাণু মুক্ত এবং প্রত্যয়িত বীজ বপন করতে হবে।
৪. সরিষার মাঠে সময়মতো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে বিশেষ করে বথুয়া পরিষ্কার করতে হবে।
৫. অনুমোদিত মাত্রায় পটাশ সার ব্যবহার করলে পাতা ঝলসানো রোগের আক্রমণ কম হয়। জমিতে পূর্ববর্তী ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং ফসল কর্তনের পর আক্রান্ত গাছের পাতা জমি থেকে সরিয়ে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৬. প্রতি কেজি বীজ ২.৫ গ্রাম হারে প্রভে´ ২০০ ডব্লিউ পি দ্বারা শোধন করে বপন করতে হবে।
৭. ১০০ গ্রাম নিমপাতায় সামান্য পানি দিয়ে পিষিয়ে তার রস ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ফসলে ১০ দিন অন্তর ৩ বার গাছে প্রয়োগ করলে রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করা যায়।
৮. এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর ৩ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে স্প্রে করলে এ রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।


২. ডাউনি মিলডিউ রোগ (Downey mildew)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Peronospora parasitica নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। এ ছত্রাক গাছের আক্রান্ত অংশে এবং বিকল্প পোষক ও স্পোর হিসেবে বেঁচে থাকে। ঠাণ্ডা (তাপমাত্রা ১০-২০ ডিগ্রি সে.) এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় (৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা) এ রোগ সহজে বিস্তার লাভ করে। এছাড়া গাছের সংখ্যা বেশি হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণ
১. গাছের চারা অবস্থার পর থেকে যেকোনো সময় এ রোগে গাছ আক্রান্ত হতে পারে।
২. আক্রান্ত পাতার নিম্নপৃষ্ঠে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক দেখা যায় এবং পাতার উপরের পৃষ্ঠ হলদে হয়ে যায়।
৩. অনুকূল আবহাওয়ায় এ ছত্রাকের বংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়; ফলে পাতা আকারে ছোট হয়ে যায়।
৪. এ রোগ পরবর্তীতে সরিষার শুঁটি আক্রমণ করে এবং বীজ হতে খাদ্য গ্রহণ করার ফলে উৎপাদন বহুলাংশে কমে যায়।
রোগের প্রতিকার
১. সুস্থ সবল ও জীবাণু মুক্ত বীজ বপণ করতে হবে।
২. ন্যাপাস জাতীয় সরিষা এ রোগ সহনশীল।
৩. সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার এবং সেচের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. শস্য পর্যায়ক্রম করতে হবে।
৫. ফসল কর্তনের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৬. বীজ বপনের আগে বীজ শোধন (প্রোভেক্স ২০০ ডব্লিউ পি ২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম/ কেজি বীজ) করে লাগাতে হবে।
৭. রোগ দেখা দেয়া মাত্র রিডোমিল এম জেড-৭২ বা ডাইথেন এম-৪৫ শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাশনাশক) ১০ দিন অন্তর ৩ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে ফসলকে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।


৩. স্ক্লেরোসিনিয়া কাণ্ড পচা রোাগ (Sclerotinia stem rot)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Sclerotinia sclerotiorum নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। এই ছত্রাক মৃত অথবা জীবন্ত উদ্ভিদে সাদা মাইসেলিয়া তৈরি করে এবং উদ্ভিদের আক্রান্ত অংশে এবং মাটিতে কালো দানার মতো স্ক্লেরোসিয়া তৈরি করে বেঁচে থাকে। এ ছাড়া আক্রান্ত বীজের মাধ্যমেও এরা বিস্তার লাভ করে থাকে। সাধারণত আর্দ্রতা অধিক (৯০-৯৫%) এবং ১৮-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় বায়ু প্রবাহের ফলে এ রোগের প্রাদুর্ভব বেশি হয়।

রোগের লক্ষণ
১. প্রাথমিক অবস্থায় সরিষার গাছের কাণ্ডে পানি ভেজা দাগ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যা পরবর্তীতে তুলার মতো সাদা মাইসেলিয়া সৃষ্টি করে।
২. আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে আক্রান্ত কাণ্ড বিবর্ণ হয়ে যায় এবং টিস্যু মারা যায়।
৩. সরিষা গাছে অকাল পক্বতা পরিলক্ষিত হয় এবং গাছ হেলে পড়ে, শুকিয়ে যায় ও মারা যায় এবং ফলন মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়।
৪. কাণ্ডের মধ্যে শক্ত কালো স্ক্লেরোসিয়া সৃষ্টি হয় এ স্ক্লেরোসিয়া অনেক সময় কাণ্ডের ওপরে দেখতে পাওয়া যায়।
রোগের প্রতিকার
১. সুস্থ সবল রোগমুক্ত প্রত্যয়িত বীজ বপন করতে হবে।
২. গ্রীষ্ম মৌসুমে গভীরভাবে জমি চাষ দিতে হবে।
৩. জমিতে আক্রান্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৪. এ রোগের পোষক নয় এমন ফসল দ্বারা শস্য পর্যায়ক্রম করতে হবে যেমন- গম, যব, ধান এবং ভুট্টা।
৫. জমিতে ট্রাইকোডারমা ভিরিডি অথবা ট্রাইকোডারমা হারজেনিয়াম প্রতি হেক্টর জমিতে ২.৫ কেজি হারে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
৬. কারবেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক ০.১ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক) ফুল আসার সময় ২০ দিন অন্তর ২ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।


৪. সপুষ্পক পরজীবী উদ্ভিদ 
(Orobanche প্রজাতি) রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Orobanche Spp. নামক এক প্রকার সপুষ্পক শিকড়-পরজীবী উদ্ভিদ যার বংশ বৃদ্ধি সরিষার ওপর নির্ভরশীল। মাটি, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, সেচের পানি প্রভৃতির মাধ্যমে রোগের বিস্তার লাভ করে। প্রতি বছর একই জমিতে সরিষা পরিবারের কোনো ফসলের চাষ করলে এ পরজীবী উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে।

রোগের লক্ষণ
১. অরোবাংকি এক প্রকার সপুষ্পক শিকড়-পরজীবী উদ্ভিদ যার বংশ বৃদ্ধি সরিষার ওপর নির্ভরশীল।
২. এর বীজ মাটিতেই অবস্থান করে।
৩. সরিষা গাছের শিকড়ের সাথে এ পরজীবী উদ্ভিদ সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে।
৪. ফলে আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়।
রোগের প্রতিকার
১. একই জমিতে প্রতি বছর সরিষা চাষ না করে অন্যান্য ফসল যেমন- ধান, গম জাতীয় ফসল (যাতে অরোবাংকি না হয়) পর্যায়ক্রমে চাষ করলে এ রোগের প্রাদুর্ভার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
২. ফল আসার আগেই এ পরজীবী উদ্ভিদ জমি হতে উঠিয়ে ফেলতে হবে।
৩. বীজ বপনের পূর্বে জমি লাঙল দিয়ে গভীরভাবে চাষ করতে হবে। এতে পরজীবী উদ্ভিদের বীজ মাটির গভীরে চলে যায় এবং সরিষার শিকড়ের সংস্পর্শে না আসায় বীজ গজাতে পারে না।
৪. টিএসপি ২৫০ কেজি/হেক্টর প্রয়োগের মাধ্যমে রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো যায়।
৫. জমিতে ২৫% কপার সালফেট দ্রবণ স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।



Source: AIS
*বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা
মো. রাজিব হুমায়ুন*

মিষ্টি আলুর রোগ ও তার প্রতিকার

মিষ্টি আলু দেশের সর্বত্রই কিছু না কিছু চাষ হয়ে থাকে। এতে প্রচুর শর্করা, খনিজ ও ভিটামিন এ বিদ্যমান। মিষ্টি আলুর চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিষ্টি আলু ফলন কম হওয়ার প্রধান কারণ বিভিন্ন প্রকার পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ। মিষ্টি আলুর ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর রোগবালাই দমন অত্যাবশ্যকীয়। তাই নিম্নে মিষ্টি আলুর কয়েকটি মারাত্মক রোগের লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১. রোগের নাম : পাতা, বোঁটা ও কাণ্ডে দাগ পড়া (Alternaria leaf, petiole and stem spot) রোগ

রোগের কারণ: অলটারনারিয়া ব্যাটাটিকোলা (Alternaria bataticola) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের বিস্তার :
আক্রান্ত লতা, বিকল্প পোষক ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। বৃষ্টি, আর্দ্র ও ঠাণ্ডা আবহাওয়া এ রোগ বৃদ্ধির সহায়ক। আক্রান্ত পাতার ওপর ছত্রাকের বীজ কণা সৃষ্টি হয় এবং পরে বাতাসের মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ :
এ রোগ সাধারণত পুরাতন ও পরিপক্ব পাতায় বেশি দেখা যায়।
রোগের আক্রমণে পাতার গায়ে বাদামি রঙের চক্রাকার দাগ দেখা যায় যা গোলাকার সীমারেখা দ্বারা আবৃত থাকে।
অনেক দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে।
দাগগুলো পুরাতন হয়ে গেলে পাতার আক্রান্ত স্থানের টিস্যু ভেঙে যায় ও পাতা ঝরে পড়ে।
দাগ কাণ্ড ও পাতার বোঁটায়ও দেখা যায়, দাগগুলো বড় হয়ে কাণ্ডকে ঘিরে ফেলে।          

রোগের প্রতিকার :       
ফসল সংগ্রহের পর আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়ে ফেলতে হবে।
সুস্থ, সবল ও জীবাণুমুক্ত লতা ব্যবহার করতে হবে।
জমিতে শস্যপর্যায় অনুসরণ করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে।
পাতায় দাগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন- রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনাকোনাজল + এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।



২. রোগের নাম : নরম পচা (Soft rot) রোগ

রোগের কারণ : রাইজোপাস নিগ্রিক্যানস (Rhizopus nigricans) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তার : আক্রান্ত টিউবারের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ :
  • এ রোগের আক্রমণের ফলে আলুতে পানি ভেজা দাগ দেখা যায়।
  • এই রোগ হলে আক্রান্ত স্থানের তন্তু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
  • আক্রান্ত আলু দুইপ্রান্ত হতে দ্রুত নরম ও আর্দ্র হয়ে পচে যায়, যা হতে দুর্গন্ধ বের হয়।
  • আক্রান্ত আলুর উপরিভাগে সাদা মাইসেলিয়ামের পুরু স্তর দেখা যায়।
  • এছাড়া প্যাথোজেনের কালো বর্ণের ফ্রুটিং বডিও দেখা যা    
রোগের প্রতিকার :     
  • ফসল সংগ্রহের পর আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়ে ফেলতে হবে।
  • জমি হতে টিউবার উত্তোলন, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে টিউবার আঘাতপ্রাপ্ত না হয়।
  • সংরক্ষণের আগে টিউবার ভালো করে কিউরিং করতে হবে।
  • এ রোগ কমানোর জন্য কাটা, ছেঁড়া ও থেঁতলানো টিউবার
  • বেছে শুধু নিখুঁত টিউবার সংরক্ষণ করতে হবে।
  • আলু গুদামজাত করার পরে সে ঘরে বায়ু চলাচলের সুব্যবস্থা রাখতে হবে।
  • আলু অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় সংরক্ষণ করতে হবে।


৩. রোগের নাম : কালচে বা ব্লাক রট/চারকোল রট (Black rot-Charcol rot) রোগ

রোগের কারণ : ম্যাক্রোফোমিনা ফ্যাজিওলিনা/ডিপ্লোডিয়া নাটালেনসিস (Macrophomina phaseolina/Diplodia natalensis) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার
গাছের পরিত্যক্ত অংশে জীবাণু বেঁচে থাকে এবং বাতাস, পানি ও পোকামাকড়ের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়।
রোগের লক্ষণঃ
  • এ রোগের আক্রমণে গাছ খর্বাকৃতির ও হলুদ রঙের হয়।
  • পরে আক্রান্ত গাছ ধীরে ধীরে কাল হয়ে যায়।
  • গুদামজাত অবস্থায় টিউবারেও এ রোগ দেখা যায়।
  • টিউবারে এ রোগের আক্রমণে কাল দাগ পড়ে।
  • পরবর্তীতে পচন শুরু হয়ে পুরো টিউবারটি পচে নষ্ট হয়ে যায়।                    

রোগের প্রতিকার      
রোগমুক্ত মিষ্টি আলুর লতা লাগাতে হবে।
শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে তার মধ্যে লতা ডুবিয়ে শোধন করে নিয়ে জমিতে লাগাতে হবে।
সংরক্ষিত টিউবারকে এ রোগের আক্রমণ হতে রক্ষা করতে টিউবারকে সংরক্ষণের পূর্বে ভালোভাবে কিউরিং করে নিতে হবে।
এ রোগ কমানের জন্য কাটা, ছেঁড়া ও থেঁতলানো টিউবার
বেছে শুধু নিখুঁত টিউবার সংরক্ষণ করতে হবে।

ফসল উঠানোর পর মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন-ডাইথেন এম ৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে টিউবারে স্প্রে করে সংরক্ষণ করতে হবে।


 ৪. রোগের নাম : পাতা কোঁকড়ানো বা লিফ কার্ল ভাইরাস (Leaf curl virus) রোগ


রোগের কারণ : লিফ কার্ল ভাইরাস (Leaf curl virus)-এর আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার
এই রোগ সাদা মাছি পোকার মাধ্যমে ছড়ায়।

রোগের লক্ষণ
এ রোগে আলুর পাতা মারাত্মকভাবে ছোট হয়ে যায়।
মিষ্টি আলুর পাতা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে কুঁকড়িয়ে যায়।
ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রোগের প্রতিকার     
রোগমুক্ত লতা লাগাতে হবে।
জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
সাদা মাছি পোকা দমনের জন্য ডায়াফেনথিউরন গ্রুপের কীটনাশক (যেমন-পেগাসাস ৫০ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।



ড. কে এম খালেকুজ্জামান
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব) মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই শিবগঞ্জ, বগুড়া,  মোবাইলঃ ০১৯১১-৭৬২৯৭৮, ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com


source: AIS

মিষ্টি আলুর পোকামাকড় দমন

পোকার নাম : পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা


পোকা চেনার উপায় : বয়ষ্ক পোকা দেখতে খুব ছোট ও ধুসর বর্ণের।
ক্ষতির ধরণ : ক্ষুদ্র কীড়া পাতার দুইপাশের সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। তাই পাতার উপর আঁকা বাঁকা রেখার মত দাগ পড়ে এবং পাতা শুকিয়ে ঝড়ে যায়।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে থায়ামিথক্সাম + ক্লোথায়ারানিলিপ্রল জাতীয় কীটনাশক (যেমনঃ ভলিউম ফ্লেক্সি ৫ মিলিলিটার অথবা ১ মুখ) অথবা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমনঃ ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার) প্রতি ১০লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


পোকার নাম : মিষ্টি আলুর উইভিল পোকা

পোকা চেনার উপায় : মাথায় শুঁড়ের মতো একটি মুখাংশ আসে। মাথা ও শাখার উপরিভাগ গাঢ় নীল চোখ এবং পা উজ্জ্বল লাল-কমলা বর্ণের।
ক্ষতির ধরণ : পাতা খেয়ে ছিদ্র করে এবং লতার ভিতরে ঢুকে কচি অংশ খেয়ে গাছ মেরে ফেলে। কীড়া কন্দমূলের/ মিষ্টি আলুর ভিতরে আঁকাবাঁকা সুড়ং করে খাবার অযোগ্য করে।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়, ফলের বাড়ন্ত পর্যায় , ফল পরিপক্ব
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , ডগা , কান্ডের গোঁড়ায়
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : লার্ভা , কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
অনুমোদিত বালাইনাশক (হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি হারে ডায়াজিনন ১৪জি বা কার্বোফুরান ৫জি) দিয়ে মাটি শোধন করে হালকা সেচ দিন। ফেরোমেন ফাঁদ পেতে পোকা নিয়ন্ত্রণ করুন। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


পোকার নাম : মিষ্টি আলুর টরটয়স বিটল পোকা

পোকা চেনার উপায় : ছোট সবুজ রঙের পোকা। গায়ে কাঁটা থাকে।
ক্ষতির ধরণ : চকচকে পূর্ণ বয়স্ক পোকা ও কাঁটাযুক্ত বাচ্চা উভয়ই কচি পাতা খেয়ে ক্ষতি করে। এরা চারা গাছের বেশি ক্ষতি করে থাকে। এরা খেয়ে পাতায় ছিদ্র করে।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : সব , পূর্ণ বয়স্ক
ব্যবস্থাপনা :
সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমনঃ ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার) প্রতি ১০লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


পোকার নাম : মিষ্টি আলুর ফ্লি বিটল পোকা

পোকা চেনার উপায় : ছোট কালো রঙের পোকা।
ক্ষতির ধরণ : পূর্ণ বয়ষ্ক ও বাচ্চা উভয়ই ক্ষতি করে। পূর্ণ বয়ষ্করা চারা গাছের বেশি ক্ষতি করে। এরা পাতা ছোট ছোট ছিদ্র করে খায়। আক্রান্ত পাতায় অসংখ্য ছিদ্র হয়।
আক্রমণের পর্যায় : চারা
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : সব , পূর্ণ বয়স্ক
ব্যবস্থাপনা :
সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমনঃ ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার) প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 Source: aisekrishi

টমেটোর পোকা মাকড় দমন

ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা


পোকা চেনার উপায় : কীড়া সাধারণত গাছের ডগায় এবং ফলে থাকে। ১-১.৫ ইঞ্চি বড় মথ। পাখাতে ছিট ছিট বাদামি দাগ থাকে।
ক্ষতির ধরণ : কচি ডগা ও ফল ছিদ্র করে কুড়ে খায়। আক্রান্ত ডগা ঢলে পড়ে শুকিয়ে যায়। ফলে আক্রমন হলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
ক্ষতির লক্ষণ : কচি ডগা ও ফল ছিদ্র করে কুড়ে খায়। আক্রান্ত ডগা ঢলে পড়ে শুকিয়ে যায় । ফলে আক্রমন হলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : ডগা , ফল
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে থায়ামিথক্সাম+ক্লোথায়ারানিলিপ্রল জাতীয় কীটনাশক (যেমন ভলিউম ফ্লেক্সি ৫ মিলিলিটার  অথবা ১মুখ ) অথবা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমন ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার ৪ মুখ  অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার ২ মুখ ) প্রতি ১০লিটার পানিতে  মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


কাটুই পোকা

পোকা চেনার উপায় : ছোট আকারের মথ, হালকা বাদামি। এরা নিশাচর অর্থাৎ রাতে এদের বেশি দেখা যায়। কীড়ার রং বেগুনী থেকে বাদামি বেগুনী। এই পোকা মাটিতে থাকে।
ক্ষতির ধরণ : রাতে চারার গোড়া কেটে ফেলে। চারা ঢলে পরতে অথবা শুকিয়ে মারা যেতে পারে।
আক্রমণের পর্যায় : চারা
পোকামাকড় জীবনকাল : কীড়া
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে কারটাপ জাতীয় কীটনাশক ( কেয়ার ৫০ এসপি অথবা সানটাপ ৫০ এসপি ২০ মিলি / ৪ মূখ ) অথবা ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন জাতীয় কীটনাশক ( ক্যারাটে ২.৫ ইসি অথবা ফাইটার প্লাস ২.৫ ইসি ১৫ মিলি / ৩ মূখ ) ১০ লিটার প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

জাব পোকা

পোকা চেনার উপায় : খুব ছোট সবুজাভ সাদা, নরম দেহ বিশিষ্ট
ক্ষতির ধরণ : পাতা, ফুল ও কচি ফলের রস চুষে খায়।তাছাড়া এই পোকা হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগ ছড়ায়।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়, যেকোন অবস্থা
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : কাণ্ড , পাতা , ডগা , ফল
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : পূর্ণ বয়স্ক , নিম্ফ
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মিলিলিটার / ২মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সাদা মাছি

পোকা চেনার উপায় : খুব ছোট হলুদাভ সাদা, নরম দেহ বিশিষ্ট
ক্ষতির ধরণ : গাছের রস চুষে খাওয়ার ফলে গাছ শুকিয়ে যায় । এই পোকা এক ধরণের রস ছড়িয়ে দেয়, যেখানে বিভিন্ন ছত্রাক আক্রমণ করে । ফলে দূর থেকে আক্রান্ত গাছকে নিস্তেজ ও কালো দেখায়। গাছের বৃদ্ধি খুবই কম হয়। তাছাড়া এই পোকা মুগ ও মাসকলাইয়ে হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগ ছড়ায়।
জৈবিক উপায়ে দমন : হলুদ রঙের ফাঁদ ব্যবহার। আক্রমণ বেশী হলে যে কোন অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়, চারা, পূর্ণ বয়স্ক
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : পূর্ণ বয়স্ক , নিম্ফ
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মিলিলিটার / ২মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

পাতা মোড়ানো পোকা

পোকা চেনার উপায় : বাদামি রংয়ের একধরনের মথ।
ক্ষতির ধরণ : ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে লালা দিয়ে কচি পাতা লম্বা লম্বি ভাবে মুড়িয়ে ফেলে । পাতা খুললে ভিতরে কীড়া পাওয়া যায়। মুড়ানো পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে ।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে থায়ামিথক্সাম+ক্লোথায়ারানিলিপ্রল জাতীয় কীটনাশক (যেমন ভলিউম ফ্লেক্সি ৫ মিলিলিটার অথবা ১মুখ ) অথবা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমন ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার) প্রতি ১০লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

শোষক পোকা/ হোপার/ শ্যামা পোকা

পোকা চেনার উপায় : হালকা হলদে সবুজ রঙের ছোট্ট পোকা। বেশির ভাগ সময় পাতার নিচের দিকে ছায়ায় থাকে।
ক্ষতির ধরণ : কচি পাতার রস চুষে খাওয়ায় পাতা কুকড়ে নিচের দিকে বেকে আসে, পাতা বিবর্ন হয়ে তামাটে রং ধারণ করে ,পরে মারা যায়।
আক্রমণের পর্যায় : চারা, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : ফল
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : পূর্ণ বয়স্ক , নিম্ফ
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মিলিলিটার / ২মুখ) অথবা কারবারাইল জাতীয় কীটনাশক (যেমন সেভিন ২০ গ্রাম) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষোধ পাতার নিচের দিকে যেখানে পোকা থাকে সেখানে স্প্রে করতে হবে। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে



source:aisekrishi

টমেটোর রোগ ও তার প্রতিকার

গোড়া ও মূল পচা  (Damping off and root rot)

 রোগের কারণ
 পিথিয়াম, রাইজোকটোনিয়া, ফাইটোপথোরা, ক্লেরোশিয়াম (Phythium, Rhizoctonia, Phytophthora, Sclerotium etc.) ও অন্যান্য মাটিবাহিত ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার ও লক্ষণ
মাটি সব সময় স্যাঁতস্যাঁতে থাকলে ক্রমাগত মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া বিরাজ করলে এবং বায়ু চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে এ রোগের আক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। রোগটি ছত্রাকের আক্রমণে বীজতলায় হয়ে থাকে। এটি একটি মারাত্মক রোগ। বীজে আক্রমণ হলে বীজ পচে যায়। বীজ অংকুরোদগমের পরেই প্রাথমিক পর্যায়ে চারা মারা যায় একে প্রিইমারজেন্স ড্যাম্পিং অফ বলে। পোস্ট-ইমারজেন্স ড্যাম্পিং অফের বেলায় চারার হাইপোকোটাইলের কর্টিক্যাল কোষ দ্রুত কুঁচকে যায় ও কালো হয়ে যায়। চারার কা- মাটির কাছাকাছি পচে চিকন হয়ে যায়। কাণ্ডের গায়ে ছত্রাকের উপস্থিতি দেখা যায়। চারার গোড়া চিকন, লিকলিকে হয়ে ঢলে পড়ে ও মারা যায়। সুনিষ্কাশিত উঁচু বীজতলা তৈরি করতে হবে যেখানে সূর্য্যালোক ও বায়ু চলাচল পর্যাপ্ত থাকে; রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে; বীজ বপনের ২ সপ্তাহ পূর্বে ফরমালডিহাইড দিয়ে বীজতলা শোধন করতে হবে; বায়োফানজিসাইড- ট্রাইগোডারমা দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করতে হবে; অর্ধ কাঁচা মুরগির বিষ্ঠা বীজ বপনের ৩ সপ্তাহ আগে হেক্টরপ্রতি ৩-৪ টন হিসেবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে; কাঠের গুঁড়া বীজতলার ওপর ৩ ইঞ্চি বা ৬ সেমি উঁচু করে ছিটিয়ে দিয়ে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে; বীজতলা রৌদ্রপূর্ণ দিনে সূর্য কিরণে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে কমপক্ষে ৩-৪ সপ্তাহ ঢেকে রাখতে হবে;  প্রোভেক্স-২০০ বা ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম) দিয়ে শোধন করে বীজ বপন করতে হবে; বীজ ৫২০ঈ তাপমাত্রায় গরম পানিতে ৩০ মিনিট রেখে শোধন করে নিয়ে বপন করতে হবে; রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ব্যভিস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা কিউপ্রাভিট প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হিসাবে মিশিয়ে চারার গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।


আগাম ধসা (Early blight)


 রোগের কারণ ও বিস্তার
 অলটারনারিয়া সোলানি (Alternaria solani)  নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়। ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, বিকল্প পোষক ও বীজে এ জীবাণু বেঁচে থাকে। উচ্চ তাপমাত্রা (২৪-২৮০ সেলসিয়াস) ও বেশি আর্দ্রতা (৮০% এর ওপরে) এ রোগ ঘটানোর জন্য সহায়ক। বৃষ্টির ঝাপটা ও বাতাসের মাধ্যমে এ রোগ সুস্থ গাছে ছড়িয়ে পড়ে। আলু, মরিচ এ রোগের বিকল্প পোষক হতে পারে। রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার : গাছের পাতা, কা- এমনকি ফলও আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত নিচের বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষ্মণ প্রথম দেখা যায়, পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে ওপরের পাতা আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত পাতার ওপর কাল কিংবা হালকা বাদামি রঙের বৃত্তাকার দাগ পড়ে। অনেক দাগ একত্রে মিশে পাতার অনেক অংশ নষ্ট করে ফেলে এবং পাতা হলদে বা বাদামি রঙ হয়ে মাটিতে ঝরে পড়ে। কাণ্ডের ছোট ছোট, গোলাকার বা লম্বা এবং ডুবা ধরনের দাগ পড়ে। পুষ্প মঞ্জুরির বোঁটা আক্রান্ত হলে ফুল ও অপ্রাপ্ত ফল ঝরে পড়ে। বয়স্ক ফলেও বৃত্তাকার দাগের সৃষ্টি হয় এবং ফলটিকে নষ্ট করে ফেলে। রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে; প্রোভেক্স-২০০ বা ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম) দ্বারা শোধন করে বীজ বপন করতে হবে; সময়মতো সুষম সার ব্যবহার ও প্রয়োজন মতো পানি সেচ করতে হবে; গাছের পরিত্যক্ত অংশ ও আগাছা একত্রিত করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে; পাতায় ২/১টি দাগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোভরাল প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হিসাবে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।    


নাবি ধসা (Late blight)


 রোগের কারণ ও বিস্তার
ফাইটপথোরা ইনফেস্ট্যান্স (Phytophthora infestans) নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। নিম্ন তাপমাত্রা (১২-১৫০ সেলসিয়াস), উচ্চ আর্দ্রতা (৯৬% এর ওপরে) ও মেঘাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। বাতাস ও সেচের মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণ ও  প্রতিকার
 প্রাথমিক অবস্থায় পাতার উপর সবুজ কালো, পানিভেজা আঁকাবাঁকা দাগ পড়ে। আর্দ্র আবহাওয়ায় এসব দাগ সংখ্যায় ও আকারে দ্রত বাড়তে থাকে এবং বাদামি থেকে কালচে রঙ ধারণ করে। মাঝে মাঝে পাতার নিচের দিকে সাদা সাদা ছত্রাক জন্মে। আক্রান্ত পাতা পচে যায়। পাতা হতে কাণ্ডের এবং কাণ্ড হতে ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ফলের উপরিভাগে ধূসর সবুজ, পানি ভেজা দাগের আবির্ভাব হয়। ক্রমশ সে দাগ বেড়ে ফলের প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে ফেলে এবং আক্রান্ত অংশ বাদামি হয়ে যায়। রোগের লক্ষণ দেখার পর নি¤œ তাপমাত্রা, আর্দ্র ও কুয়াশাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যঁতে আবহাওয়া বিরাজ করলে ৩-৪ দিনের মধ্যে গাছ ঝলসে যায় ও দ্রুত মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফসল উঠার পর জমির আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশগুলো একত্র করে পুড়ে ফেলতে হবে; রোগমুক্ত এলাকা হতে সুস্থ বীজ সংগ্রহ করতে হবে; আলু ও টমেটো গাছ পাশাপাশি লাগান উচিত নয় এবং আলু ও টমেটো ছাড়া জমিতে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে; রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে; নি¤œ তাপমাত্রা, উচ্চ আর্দ্রতা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া মাত্র মেলোডি ডিও প্রতি লিটার  পানিতে ২ গ্রাম ও সিকিউর প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে একত্রে মিশিয়ে গাছের পাতার ওপরে ও নিচে ভিজিয়ে ৭ দিন পর পর কমপক্ষে ৩ বার স্প্রে করতে হবে।      


 
ফিউজারিয়াম ঢলে পড়া (Fusarium wilt)

 রোগের কারণ ও লক্ষণ
 ফিউজারিয়াম অক্সিস্পোরাম এফ. এসপি. লাইকোপারসিসি (Fusarium oxysporum f. sp. lycopersici)  নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়। চারা গাছের বয়স্ক পাতাগুলো নিচের দিকে বেঁকে যায় ও ঢলে পড়ে। ধীরে ধীরে পুরো গাছই নেতিয়ে পড়ে ও মরে যায়। গাছের কাণ্ডে ও শিকড়ে বাদামি দাগ পড়ে।  গাছে প্রথমে কাণ্ডের এক পাশের শাখার পাতাগুলো হলদে হয়ে আসে এবং পরে অন্যান্য অংশ হলুদ হয়ে যায়। রোগ বৃদ্ধি পেলে সব পাতাই হলুদ হয়ে যায় এবং অবশেষে সম্পূর্ণ শাখাটি মরে যায়। এভাবে পুরো গাছটাই ধীরে ধীরে মরে যায়। সম্ভব হলে ফরমালিন দিয়ে মাটি শোধন করতে হবে; নীরোগ বীজতলার চারা লাগাতে হবে; আক্রান্ত গাছ ধ্বংস করতে হবে; জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে; জমিতে উপযুক্ত পরিমাণে পটাশ সার প্রয়োগ করলে রোগ অনেক কম হয়; শিকড় গিট কৃমি দমন করতে হবে কারণ এটি ছত্রাকের অনুপ্রবেশে সাহায্য করে; রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ব্যভিস্টিন প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা কিউপ্রাভিট প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হিসাবে মিশিয়ে চারার গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।  


ঢলে পড়া (Bacterial wilt)

 রোগের কারণ ও বিস্তার
 রালসটোনিয়া সোলানেসিয়ারাম (Ralstonia solanacearum) নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হয়। গাছের পরিত্যক্ত অংশ, মাটি ও বিকল্প পোষকে এ রোগের জীবাণু বেঁচে থাকে। সেচের পানি ও মাঠে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। উচ্চ তাপমাত্রা (২৮-৩২০ সেলসিয়াস) ও অধিক আর্দ্রতায় এ রোগ দ্রুত ছড়ায়।
রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার :
গাছ বৃদ্ধির যে কোনো সময় এ রোগ হতে পারে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে। আক্রান্ত গাছের পাতা ও ডাঁটা খুব দ্রুত ঢলে পড়ে এবং গাছ মরে যায়। গাছ মরার পূর্ব  পর্যন্ত পাতায় কোনো প্রকার দাগ পড়ে না। মাটির ওপরে আক্রান্ত গাছের গোড়া থেকে সাদা রঙের শিকড় বের হয়। রোগের প্রারম্ভে কাণ্ডের নিম্নাংশ চিরলে এর মজ্জার মধ্যে কালো রঙের দাগ দেখা যায় এবং চাপ দিলে তা থেকে ধূসর বর্ণের তরল আঠাল পদার্থ বের হয়ে আসে। এ তরল পদার্থে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাছাড়া আক্রান্ত গাছের গোড়ার দিকের কা- কেটে পরিষ্কার গ্লাসে পানিতে ডুবিয়ে রাখলে সাদা সুতার মতো ব্যাকটেরিয়াল উজ বের হয়ে আসতে দেখা যায়। রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে; বুনো বেগুন গাছের কাণ্ডের সাথে কাক্সিক্ষত জাতের টমেটোর জোড় কলম করতে হবে; শস্য পর্যায়ে বাদাম, সরিষা, ভুট্টা ফসল চাষ করতে হবে; রোগাক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র মাটিসহ তুলে ধ্বংস করতে হবে; টমেটোর জমি স্যাঁতস্যাঁতে রাখা যাবে না; হেক্টর প্রতি ২০ কেজি স্টেবল ব্লিচিং পাউডার শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে; স্ট্রেপ্টোমাইসিন সালফেট (অক্সিটেট্রাসাইক্লিন) ২০ পিপিএম অথবা ক্রোসিন এজি ১০ এসপি ০.৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৪-৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।


পাতা কুঁকড়ানো (Leaf curl)

রোগের কারণ ও বিস্তার :
 ভাইরাসের (Virus) আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। সাদা মাছি নামক পোকার আক্রমণে এ রোগ অসুস্থ গাছ থেকে সুস্থ গাছে সংক্রমিত হয়। রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার : গাছ খর্বাকৃতির হয়ে যায়। পাতার গায়ে ঢেউয়ের মতো ভাঁজ সৃষ্টি হয় ও পাতা ভীষণভাবে কুঁকড়িয়ে যায়। বয়স্ক কুঁকড়ানো পাতা পুরু ও মচমচে হয়ে যায়। আক্রমণের মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে পাতা মরে যায়। গাছে অতিরিক্ত শাখা হয় ও গাছ সম্পূর্ণরূপে ফুল, ফল ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। রোগাক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে ধ্বংস করতে হবে; রোগাক্রান্ত চারা কোনো অবস্থাতেই লাগানো যাবে না; সুস্থ গাছ থেকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংগ্রহ করতে হবে; গাউচু নামক কীটনাশক (৫ গ্রাম/কেজি বীজ) দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে; পোকা দমনের জন্য এডমায়ার কীটনাশক ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।


হলুদ মোজাইক (Mosaic) ভাইরাস

 রোগের কারণ ও বিস্তার

 ভাইরাসের (Virus) আক্রমণে এ রোগ হয়। সাদা মাছি নামক পোকার আক্রমণে এ রোগ অসুস্থ গাছ হতে সুস্থ গাছে সংক্রমিত হয়। রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার : অল্প বয়সে টমেটো গাছ রোগাক্রান্ত হলে গাছ খর্বাকৃতির হয়। গাছের পাতার শিরার রঙ হলুদ হয়ে যায়।  আক্রান্ত পাতা স্বাভাবিক সবুজ রঙ হারিয়ে হালকা সবুজ ও ফ্যাকাশে হলুদ রঙের মিশ্রণ সৃষ্টি করে। পাতার অনুফলকগুলো কিছুটা কুঁচকিয়ে বিকৃত হয়ে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে পুরো পাতা হলুদ হয়ে যায়। আক্রান্ত গাছের ফলন কম হয় ও ফলের স্বাভাবিক আকার নষ্ট হয়ে যায়।    
সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে ও সুস্থ চারা লাগাতে হবে; রোগাক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে ধ্বংস করতে হবে; জমিতে কাজ করার সময় তামাক, বিড়ি, সিগারেট ধূমপান করা থেকে বিরত থাকতে হবে; গাউচু নামক কীটনাশক (৫ গ্রাম/কেজি বীজ) দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে; পোকা দমনের জন্য এডমায়ার কীটনাশক ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।



শিকড় গিট (Root knot)


 রোগের কারণ ও বিস্তার 

মেলোয়ডোগাইনি (Meloidogyne spp) প্রজাতির কৃমির আক্রমণে হয়। কৃমি মাটিতে বসবাস করে। সাধারণত মাটির উপরিভাগে এরা অবস্থান করে। উচ্চ তাপমাত্রা (২৫-২৮০ সে.) ও হালকা মাটি এদের বসবাস ও বংশবিস্তারের জন্য খুবই সহায়ক। বৃষ্টি ও সেচের পানি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এদের বিস্তার হয়।
রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
মাটিতে অবস্থানকারী কৃমির আক্রমণের ফলে আক্রান্ত স্থলের কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় ও সে স্থান স্ফিত হয়ে নট বা গিটের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত গাছ দুর্বল, খাট ও হলদেটে হয়ে যায়। আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়। গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে শিকরে গিটের উপস্থিতি দেখে সহজেই এ রোগ শনাক্ত করা যায়। চারা গাছ আক্রান্ত হলে সব শিকড় নষ্ট হয়ে যায় ও দিনের বেলায় গাছ ঢলে পড়ে। ফুল ও ফল ধারণ ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়। রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে; জমিতে সরিষা, বাদাম, গম, ভুট্টা প্রভৃতি শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে; শুষ্ক মৌসুমে জমি পতিত রেখে ২-৩ বার চাষ দিয়ে মাটি ভালোভাবে শুকাতে হবে; জমি পতিত রাখলে আগের ফসলের কৃমি মারা যায়, তাই সম্ভব হলে জমি পতিত রাখতে হবে; জমি জলাবদ্ধ রাখলেও কৃমি মারা যায়, তাই সম্ভব হলে জমি কয়েক সপ্তাহ হতে কয়েক মাস পর্যন্ত জলাবদ্ধ রাখতে হবে; বীজতলা রৌদ্রপূর্ণ দিনে সূর্য কিরণে স্বচ্ছ পলিথিন দ্বারা কমপক্ষে ৩-৪ সপ্তাহ ঢেকে রাখতে হবে; অর্ধ কাঁচা মুরগির বিষ্ঠা হেক্টরপ্রতি ৪-৫ টন চারা লাগানোর ২১ দিন আগে জমিতে প্রয়োগ করে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে; চারা লাগানোর সময়  হেক্টর প্রতি ৩০ কেজি ফুরাডান ৫ জি মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।

 source: ais

বেগুনের পোকা মাকড় ব্যবস্থাপনা

বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা

পোকা চেনার উপায় : ছোট আকারের মথ, ৮-১২ মি মি লম্বা সাদা রং এর দুই জোড়া পাখাতে ছিট ছিট বাদামি দাগ থাকে, স্ত্রী মথ একটু বড়।
ক্ষতির ধরণ : ডগা ও ফল ছিদ্র করে কুড়ে খায়। আক্রান্ত ডগা ঢলে পড়ে শুকিয়ে যায়। ফলে আক্রমন হলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
ক্ষতির লক্ষণ : ডগা ও ফল ছিদ্র করে কুড়ে খায়। আক্রান্ত ডগা ঢলে পড়ে শুকিয়ে যায়। ফলে আক্রমন হলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
যান্ত্রিক উপায়ে দমন : অন্তত সপ্তাহে কয়েকবার আক্রান্ত ডগা ও ফল থেকে পোকা সংগ্রহ করে তা নষ্ট করুন। কীটনাশকের বদলে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করুন। নিদিষ্ট সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করুন। নিমের পাতা বা ফল বেটে ছেঁকে নির্যাস ৫-৬ গুন পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করুন। আলোক ফাঁদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন সেক্স ফেরোমন ফাঁদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন
আক্রমণের পর্যায় : চারা, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
পোকামাকড় জীবনকাল : কীড়া
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : ডগা , ফল
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে থায়ামিথক্সাম+ক্লোথায়ারানিলিপ্রল জাতীয় কীটনাশক (যেমন ভলিউম ফ্লেক্সি ৫ মিলিলিটার অথবা ১মুখ ) অথবা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমন ওস্তাদ ২০ মিলিলিটার ৪ মুখ অথবা ম্যাজিক অথবা কট ১০ মিলিলিটার ২ মুখ ) প্রতি ১০লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 পোকার নাম : সাদা মাছি

চিত্রঃ সাদামাছি

পোকা চেনার উপায় : খুব ছোট হলুদাভ সাদা, নরম দেহ বিশিষ্ট
ক্ষতির ধরণ : গাছের রস চুষে খাওয়ার ফলে গাছ শুকিয়ে যায় । এই পোকা এক ধরণের রস ছড়িয়ে দেয়, যেখানে বিভিন্ন ছত্রাক আক্রমণ করে । ফলে দূর থেকে আক্রান্ত গাছকে নিস্তেজ ও কালো দেখায়।
আক্রমণের পর্যায় : চারা, পূর্ণ বয়স্ক
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : সম্পূর্ণ গাছ
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : পূর্ণ বয়স্ক , কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মিলিলিটার / ২মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 পোকার নাম : জাব পোকা
চিত্রঃ জাবপোকা

পোকা চেনার উপায় : পূর্নাঙ্গ পোকা এবং বাচ্চা উভয় ই দেখতে ছোট আকৃতির, নরম, বাদামি অথবা বাদামি কাল রঙের । দলবদ্ধ ভাবে থাকে। দেহের পিছনে উভয় দিকে একজোড়া কালো নল আছে।
ক্ষতির ধরণ : পূর্নাঙ্গ পোকা এবং বাচ্চা গাছের পাতা, কচি কাণ্ড, ফুল ও ফলের কুঁড়ি, বোটা এবং ফলের কচি অংশের রস চুষে খায়, ফলে গাছ দুর্বল ও হলুদ হয়ে যায়, পাতা কুচকে যায় । ফুল ও ফল অবস্থায় আক্রমন হলে ফুলের কুঁড়ি ঝারে পড়ে । আক্রমনের মাত্রা বেশি হলে কচি ডগা মারা যায়।
আক্রমণের পর্যায় : বাড়ন্ত পর্যায়, চারা, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
পোকামাকড় জীবনকাল : পূর্ণ বয়স্ক, কীড়া
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : কাণ্ড , পাতা , কচি পাতা , ফুল
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : লার্ভা , ফেজ -১ , কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (যেমন এডমায়ার অথবা টিডো ৭-১০ মিলিলিটার / ২মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ২/৩ বার। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

পোকার নাম : খুদে লাল মাকড়

চিত্রঃ মাকড়

পোকা চেনার উপায় : খুদে লাল রঙের মাকড় পাতার নিচে দলবদ্ধ ভাবে থাকে। প্পাতায় খুব ছোট সাদা সাদা দাগ দেখা যায় ।
ক্ষতির ধরণ : পাতার রস চুষে খায় তাই পাতা বিন্দু বিন্দু হলুদে দাগের মত হয়ে পরে সাদাটে হয়ে যায়।অতি ক্ষুদ্র মাকড় পাতার উল্টো দিকে দেখা দেয়।কখনও কখনও এরা এক যায়গায় ঘনভাবে জড় হয়।
দমন ব্যবস্থা : সুষম সার ব্যবহার করুন।সঠিক দুরত্বে চারা রোপন করুন।ক্ষেত পরিস্কার পরচ্ছন্ন রাখুন ।জমিতে পরিমিত পরিমানে জৈবসার প্রয়োগ করুন। পানি স্প্রে করুন বা ঝরনা সেচ প্রদান করুন।
আক্রমণের পর্যায় : চারা, পূর্ণ বয়স্ক, সব, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে আক্রমণ করে : পাতা , কচি পাতা
পোকার যেসব স্তর ক্ষতি করে : সব , পূর্ণ বয়স্ক
ব্যবস্থাপনা :
আক্রমন বেশি হলে সালফার জাতীয় কীটনাশক (যেমন কুমুলাস ডিএফ বা রনোভিট ৮০ ডব্লিউজি বা থিওভিট ৮০ ডব্লিউজি বা সালফোলাক ৮০ ডব্লিউজি, ম্যাকসালফার ৮০ ডব্লিউজি বা সালফেটক্স ৮০ ডব্লিউজি ২৫ গ্রাম )অথবা এবামেক্টিন জাতীয় (ভার্টিমেক ২০ গ্রাম) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

source: aisekrishi

বেগুনের রোগ ও তার প্রতিকার



১। রোগের নামঃ ঢলে পড়া বা গোড়া ও মূল পচা  (Damping off or foot and root rot ) রোগ
 
রোগের কারণঃ পিথিয়াম, রাইজোকটোনিয়া, ফাইটোপথোরা, ফিউজারিয়াম, স্কে¬রোশিয়াম (Phythium, Rhizotocnia, Phytophthora, Fusarium, Seclerotium etc.)  ইত্যাদি ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ উচ্চ আর্দ্রতা ও উচ্চ তাপমাত্রা (২৭-৩১০ সেঃ), ঘন গাছ এবং স্যাঁতস্যাঁতে মাটি রোগ বিস্তারের অনুকুল পরিবেশ।
রোগের লক্ষণঃ
  •   এই রোগটি নার্সারীতে হয়ে থাকে। ইহা একটি মারাত্মক রোগ।
  •   বীজ অংকুরোদগমের সময় আক্রমণ শুরু করে।
  •   পরে চারার হাইপোকোটাইল, কান্ডের গোড়া ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত প্রধান মূলে আক্রমণ করে।
  •   আক্রান্ত চারার কান্ডের গোড়ার অংশে ফ্যাকাশে সবুজ ও বাদামী দাগ দেখা যায়।
  •   দাগটি কান্ডের উপরের দিকে ও নীচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
  •   চারার গোড়ার আক্রান্ত অংশের কোষ সমূহ পচে যায়।
  •   চারা ঢলে পড়ে ও মারা যায়।
প্রতিকারঃ 
    •   সুনিষ্কাশিত উচু বীজতলা তৈরী করতে হবে।
    •  বীজ বপনের ২ সপ্তাহ পূর্বে ফরমালডিহাইড দ্বারা বীজতলা শোধন করতে হবে।
    •   ট্রাইগোডারমা  দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
    •   বীজতলার পানি নিস্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে।
    •    তিন-চার ইঞ্চি পুরু করে কাঠের গুড়া বীজতলায়  বিছিয়ে দিতে হবে। একটু কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে। একদিন পর জমি তৈরী করে বীজ লাগান যাবে।
    •  পলিথিন দ্বারা মাটি সোলারাইজেশন করতে হবে। ভালো করে তৈরী করে জমি কাঁদা করে নিতে হবে, স্বচছ পলিথিন সিট দিয়ে এমনভাবে ঢাকতে হবে যেন কোন প্রকার ছিদ্র না থাকে। ৩-৪ সপ্তাহ রৌদ্রময় দিনে মাটি ঢেকে রেখে শুকাতে হবে।
    •    কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
    •    বীজ ৫২০ সেঃ তাপমাত্রায় গরম পানিতে ৩০ মিনিট রেখে শোধন করে নিয়ে বপন করতে হবে।
    •    কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) বা মেটালে´িল + মেনকোজেব  (রিডোমিল গোল্ড) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

২। রোগের নামঃ ফোমোপসিস ব্লাইট/ফল ও কান্ড পচা (Phomopsis blight/Fruit and stem rot) রোগ
 
রোগের কারণঃ ফোমপসিস ভেক্সান্স (Phomopsis vexans) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ
মাটি, আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ ও বীজের মাধ্যমে এ রোগ সংক্রমিত হয়। অনুকুল আবহাওয়ায় গাছের পরিত্যক্ত অংশে প্রচুর পিকনিডিওস্পোর উৎপন্ন হয় এবং গাছে বিস্তৃত হয়ে রোগ সংক্রমণ করে। গাছে পুষ্টির অভাব হলে এ রোগের ব্যাপকতা বেড়ে যায়। আর্দ্র আবহাওয়া ও অধিক তাপমাত্রায় (২৭-৩২০ সেঃ) এ রোগ দ্রুত বুিদ্ধ পায়।
রোগের লক্ষণঃ
  •   বীজ, চারা, কান্ড, ডাল, পাতা, ফুল ও ফল এই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়।
  •  গাছের পাতা যে কোন সময় আক্রান্ত হতে পারে।
  •  সাধারণত: নীচের পাতায় প্রথম দাগ দেখা যায়, পরে দাগগুলি স্পষ্ট গোলাকার ও ধূসর বাদামী রং ধারন করে।
  •  বয়স্ক দাগে অনেক কালো কালো পিকনিডিয়া দেখা যায়।
  •  বেশী আক্রান্ত পাতা হলুদ হয়ে মারা যায় ও ঝরে পড়ে।
  •  মাটির সংযোগস্থলে গাছের কান্ড হঠাৎ সরু হয়ে যায়।
  •  কান্ডের গোড়ার দিকে ক্যাংকার সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে বাকল খসে পড়ে এবং ভিতরের কাঠ বেরিয়ে পড়ে।
  •  আক্রান্ত স্থলের ক্ষতস্থানে ছত্রাকের কালো কালো পিকনিডিয়া দেখা যায়।
  •  ফল গাছে থাকতেই আক্রান্ত হয়।
  •  ফলের উপর ফ্যাকাশে কিছুটা বসানো দাগ পড়ে, আক্রান্ত স্থলে বাদামী ক্ষতের সৃষ্টি হয় ও কালো ছত্রাক দৃষ্টিগোচর হয়।
  •         আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে যায়।
প্রতিকার ঃ 
    •      সুস্থ ও নীরোগ বেগুন হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
    •       কালো ও কুচকানো বীজ ব্যবহার করা উচিত নয়।
    •       কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
    •     বেগুন পরিবারের সব্জি বাদ দিয়ে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
    •    এই ছত্রাকটি আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশসমূহে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে, তাই আক্রান্ত গাছ, ঝড়ে পরা পাতা, ডালপালা একত্র করে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
    •     কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম বা প্রোপিকোনাজোল (টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি লিটার হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার জমির সব গুলো গাছে স্প্রে করতে হবে।

৩। রোগের নামঃ পাতায় দাগ পড়া বা পাতায় দাগ (Leaf spot) রোগ
 
রোগের কারণঃ অলটারনারিয়া মেলোনজেনি ও সারকোস্পোরা মেলোনজেনি (Alternaria melongenae and Cercospora Melongenae) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ
সাধারণত গাছের রোগাক্রান্ত পরিত্যক্ত অংশ, বিকল্প পোষক ও বায়ুর সাহায্যে এ রোগ সুস্থ গাছে ছড়ায়। তাছাড়া পরিমিত পানি ও পুষ্টির অভাবে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
অলটারনারিয়া পাতার দাগ রোগের লক্ষণঃ  
  •   অলটারনারিয়া ছত্রাক দ্বারা আক্রমণের ফলে পাতায় কেন্দ্রীভূত বাদামী রংয়ের চক্রাকারে পেঁচানো গোলাকার দাগ পড়ে।
  •   দাগগুলো বেশীর ভাগই অসম, দাগ গুলোর ব্যাস ৪-৮ মিমিঃ এবং ইহা বেড়ে পত্রফলকের বড় একটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত হয়ে থাকে।
  •   মারাত্মক আক্রমণের ফলে পাতাগুলো ঝলসে যায় ও ঝরে পরে।
  •   ফল-এ বসানো দাগের সৃষ্টি করে।
  •   আক্রান্ত ফল হলুদ হয়ে অপ্রাপ্ত অবস্থায়ই ঝরে পড়ে।
সারকোস্পোরা পাতার দাগ রোগের লক্ষণঃ
  •   সারকোস্পোরা ছত্রাক দ্বারা আক্রমণের ফলে পাতায় কোনাকার থেকে অসম ধরনের দাগ পড়ে।
  •   পরে দাগ গুলি বড় হয় ও সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়।
  •   দাগগুলোর কেন্দ্রস্থল ধূসর ও চারদিক ফ্যাকাশে হলুদ বলয় দ্বারা ঘিরে থাকে।
  •   রোগের মাত্রা বেশী হলে পাতা মুচরিয়ে যায় এবং পরে ঝলসে গিয়ে ঝরে পড়ে।
  •   ফলে ফলন অনেক কমে যায়।
প্রতিকারঃ  
    •   ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
    •   পরিমিত সার ও সময়মত সেচ প্রয়োগ করতে হবে।
    •   সময়মত ও সঠিক দূরত্বে বজায় রেখে চারা রোপন করতে হবে।
    •   অলটারনারিয়া পাতার দাগ রোগের এর জন্য ইপরোডিয়ন (রোভরাল ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনোকোনাজল + এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন (এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার বেগুন গাছে ¯েপ্র করতে হবে।
    •   সারকোস্পোরা পাতার দাগ রোগের এর জন্য কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম বা প্রোপিকোনাজোল (টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার বেগুন গাছে স্প্রে করতে হবে।

৪।  রোগের নামঃ  ফিউজারিয়াম ঢলে পড়া (Fusarium wilt)
 
রোগের কারণঃ ফিউজারিয়াম অক্সিস্পোরাম (Fusarium oxysporum) নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ 
রোগাক্রান্ত গাছ ও মাটি হতে সেচের পানি, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি  দ্বারা এ রোগ সুস্থ গাছে ছড়ায়। উচ্চ তাপমাত্রা (২৮-৩০০ সেঃ), মাটির পিএইচ ৫.৫, অধিক আর্দ্রতা, স্যাঁতস্যাঁতে মাটি এবং একই জমিতে বার বার বেগুন পরিবারের সব্জির চাষ এ রোগের উৎপত্তি ও বিস্তারের জন্য সহায়ক।
রোগের লক্ষণঃ
  •   চারা গাছ থেকে শুরু করে যে কোন অবস্থায় গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
  •   চারা গাছের বয়স্ক পাতাগুলো নীচের দিকে বেঁকে যায় ও ঢলে পড়ে।
  •   ধীরে ধীরে সমস্ত গাছই নেতিয়ে পড়ে ও মরে যায়।
  •   গাছের কান্ডে ও শিকড়ে বাদামী দাগ পড়ে।
  •   গাছে প্রথমে কান্ডের এক পাশের শাখার পাতাগুলো হলদে হয়ে আসে এবং পরে অন্যান্য অংশ হলুদ হয়ে যায়।
  •   রোগ বৃদ্ধি পেলে সমস্ত পাতাই হলুদ হয়ে যায় এবং অবশেষে সম্পূর্ন শাখাটি মরে যায়।
  •   এই ভাবে একটা একটা শাখা মরতে মরতে সমস্ত গাছটাই ধীরে ধীরে মরে যায়।
  •   আক্রান্ত কান্ড চিরলে ভিতরে বাদামী দাগ দেখা যায়।
প্রতিকারঃ
    •   সম্ভব হলে ফরমালিন দ্বারা মাটি শোধন করতে হবে।
    •   নীরোগ বীজতলার চারা লাগাতে হবে।
    •   রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন বারি বেগুন ৬, বারি বেগুন ৭, বারি বেগুন ৮ চাষ করতে হবে।
    •   রোগাক্রান্ত গাছ ধ্বংস করতে হবে।
    •   বুনো বেগুন গাছের কান্ডের সাথে কাংখিত জাতের বেগুনের জোড় কলম করতে হবে।
    •   জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
    •   জমিতে উপযুক্ত পরিমাণে পটাশ সার প্রয়োগ করলে রোগ অনেক কম হয়।
    •   শিকড় গিট কৃমি দমন করতে হবে কারণ ইহারা ছত্রাকের অনুপ্রবেশে সাহায্য করে।
    •   কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

৫।  রোগের নামঃ  ব্যাকটেরিয়া ঢলে পড়া (Bacterial wilt) রোগ
 
রোগের কারণঃ রাল্সটোনিয়া সোলানেসিয়ারাম (Ralstonia Solanacearum) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ ইহা মাটিবাহিত রোগ, কৃষি যন্ত্রপাতি, আক্রান্ত চারা ও সেচের পানি দ্বারা দ্রুত রোগ ছড়ায়। ব্যাকটেরিয়া ৩৫-৩৭ ডিগ্রি সেঃ তাপমাত্রায় উপযুক্তভাবে বিকাশ লাভ করে। মাটির পিএইচ ৭.৪ এবং ৩৭০ সেঃ তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া সব চেয়ে বেশী আক্রমণ ঘটায়।
রোগের লক্ষণঃ
  •   গাছের যে কোন বয়সে রোগটি দেখা যায়।
  •   আক্রান্ত গাছের পাতা ও ডাটা খুর দ্রুত ঢলে পড়ে।
  •   আক্রান্ত গাছ বিকালের দিকে ঢলে পড়ে আবার সকালের দিকে সতেজ হয়।
  •   এভাবে ৩-৪ দিন পর সকালেও সতেজ হয় না এবং গাছ সবুজ অবস্থাতেই ঢলে পড়ে ও মরে যায়।
  •   গাছ মরার পূর্ব পর্যন্ত পাতায় কোন প্রকার দাগ পড়ে না।
  •   কান্ডের নিম্নংশ চিরলে উহার মজ্জার মধ্যে কালো রং-এর দাগ দেখা যায় এবং চাপ দিলে উহা হতে ধূসর বর্নের তরল আঠাল পদার্থ বের হয়ে আসে। এই তরল পদার্থে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া থাকে।
  •   আক্রান্ত গাছের ডাল বা গোড়া কেটে গ্লাসে পরিস্কার পানিতে রাখলে দুধের মত সাদা সুতার মত ব্যাটেরিয়াল ওজ বের হয়ে আসে।
প্রতিকারঃ
  •   সুস্থ চারা সংগ্রহ করতে হবে।
  •   রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন- বারি বেগুন ৬, বারি বেগুন ৭, বারি বেগুন ৮ চাষ করতে হবে।
  •   বুনো বেগুন গাছের কান্ডের সাথে কাংখিত জাতের বেগুনের জোড় কলম করতে হবে।
  •   শস্য পর্যায়ে বাদাম, সরিষা, ভূট্টা ইত্যাদি ফসল চাষ করতে হবে।
  •   জমিতে সর্বশেষ চাষের পূর্বে স্টেবল ব্লি­চিং পাউডার (২০-২৫ কেজি/হেক্টর হারে) মাটিতে মিশানোর সাথে সাথেই হালকা সেচ এর ব্যবস্থা করতে হবে।
  •   ঢলে পড়া চারা বা গাছ দেখা মাত্র মাটি সহ তুলে ধ্বংস করতে হবে।
  •   জমিতে পরিমিত সেচ দিতে হবে। বেগুনের জমি স্যাঁতস্যাঁতে রাখা যাবে না।
  •   শিকড় গিট কৃমি দমন করতে হবে কারণ ইহারা ছত্রাকের অনুপ্রবেশে সাহায্য করে।
  •   ট্রাই ব্যাসিক কপার সালফেট (কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি) ১ লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার জমিতে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
  •   ব্যাকটেরিয়া নাশক স্ট্রেপ্টোমাইসিন সালফেট + টেট্রাসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড (ক্রোসিন-এজি ১০ এসপি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৮ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার জমিতে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
বি:দ্র: ক্রোসিন-এজি ১০ এসপি ও কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি ঔষধ দুইটি পর্যায়ক্রমে একটা ব্যবহার করার পর আরেকটি ব্যবহার করতে হবে।

৬। রোগের নামঃ  ক্ষুদ্র পাতা/গুচ্ছ পাতা/তুলসি লাগা (Little Leaf ) রোগ
 
রোগের কারণঃ মাইকোপ্লাজমা (Mycoplasma) দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ সংস্পর্শ ও সিসটিয়াস ফাইসিটিস (Cestius phycitis) নামক পাতা ফড়িং-এর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। অধিক তাপমাত্রা ও একই জমিতে বার বার বেগুনের চাষ এ রোগ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। ধুতরা ও তামাক এ রোগের বিকল্প পোষকের মধ্যে অন্যতম। গাছের মাঝামাঝি বয়সে এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের লক্ষণঃ 
  •   আক্রান্ত গাছের আগায় বা ডগায় অসংখ্য ছোট ছোট পাতা হয়।
  •   আক্রান্ত গাছের পাতার আকৃতি খুব ছোট হয়।
  •   আক্রান্ত পাতার ধার হলুদ বা সাদা রং ধারন করে।
  •   পাতার বোটা ও কান্ডের পর্বগুলি অত্যন্ত ছোট হয়ে যায়। অনেক সময় বোটা সহজে চেনা যায় না।
  •   পাতাগুলি গুচ্ছাকৃতির মনে হয় ও গাছ খর্বাকৃতির হয়।
  •   ফুলের বিভিন্ন অংশ রূপান্তরিত হয়ে পাতার আকৃতি ধারন করে।
  •   আক্রান্ত গাছ সাধারনত: বন্ধ্যা হয়, ফুল-ফল ধারন করে না।
  •   যদিও ২/১ টি ফল ধারণ করে তবে সে গুলো ছোট ও খুবই শক্ত হয়।
 
প্রতিকারঃ
    •   সুস্থ ও নীরোগ বেগুন হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
    •   চারা লাগানোর সময় চারা ১০০০ পিপিএম টেট্রাসাইক্লিন দ্রবনে ডুবিয়ে লাগাতে হবে এবং চারা রোপণের পর ১ সপ্তাহ পর পর ৪-৫ সপ্তাহ পর্যন্ত ৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।
    •   আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে ধ্বংস করতে হবে।
    •   তামাক ও ধুতুরা জাতীয় আগাছা ধ্বংস করতে হবে।
    •   বাহক পোকা পাতা ফড়িং দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড (অ্যাডমায়ার/ইমিটাফ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ডায়াজিনন (৬০ তরল) প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি হারে পানিতে মিশিয়ে জমিতে স্প্রে করতে হবে।

৭। রোগের নামঃ  শিকড় গিট (Root Knot) রোগ
 
রোগের কারণঃ  মেলোয়ডোজাইন ইনকগনিটা এবং মেলোয়ডোজাইন যাভানিকা (Meloidogyne incognita & M. Javanica) নামক কৃমির দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।
রোগের বিস্তারঃ 
  •     মেলোয়ডোজাইন প্রজাতির কৃমি মাটিতে বসবাস করে। আক্রান্ত মাটি, শিকড়ের অংশ, বৃষ্টি ও সেচের পানি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির দ্বারা এ রোগ বিস্তার লাভ করে। সাধারণত ২৭-৩০০ সেঃ তাপমাত্রা, হালকা মাটি ও একই জমিতে বৎসরের পর বৎসর বেগুন বা টমেটো পরিবারের সব্জির চাষ করলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
রোগের লক্ষণ ঃ 
  •   এ রোগ চারা অবস্থা থেকেই শুরু হয়।
  •   মাটিতে অবস্থানকারী কৃমির আক্রমণের ফলে আক্রান্ত স্থলের কোষ সমুহ দ্রুত বৃদ্ধি পায় ও ঐ স্থান স্ফীত হয়ে নট বা গিটের সৃষ্টি করে।
  •   আক্রান্ত গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়।
  •   আক্রান্ত গাছ দুর্বল, খাট ও হলদেটে হয়ে যায়।
  •   গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে শিকড়ে গিটের উপস্থিতি দেখে সহজেই এ রোগ সনাক্ত করা যায়।
  •   চারা গাছ আক্রান্ত হলে সমস্ত শিকড় নষ্ট হয়ে যায় ও দিনের বেলায় গাছ ঢলে পড়ে।
  •   ফুল ও ফল ধারন ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়।
প্রতিকারঃ
  •   জমিতে সরিষা, বাদাম, গম, ভূট্টা প্রভৃতি শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
  •   ফসল সংগ্রহের পর অবশিষ্টাংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  •   জমি প্লাবিত করে রাখলে এ রোগের কৃমি মারা যায়, তাই সুযোগ থাকলে বছরে একবার প্লাবিত করে রাখতে হবে।
  •   হেক্টর প্রতি ৫ টন অর্ধ পচা মুরগীর বিষ্ঠা জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের ২-৩ সপ্তাহ পর জমিতে চারা রোপন করতে হবে।
  •   শুষ্ক মৌসুমে জমি পতিত রেখে ২/৩ বার চাষ দিয়ে মাটি ভালভাবে শুকাতে হবে।
  •   রোগের লক্ষণ দেখা গেলে হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি কার্বোফুরান (ফুরাডান ৫জি) অথবা ইসাজোফস (মিরাল ৩জি) মাটিতে ছিটিয়ে ভালভাবে মিশিয়ে দিয়ে হালকা সেচ দিতে হবে।

source: krishibarta